প্রশ্ন- আপনারা আর্যরা শুধু বেদ বেদ করেন অথচ গীতাতো বেদকে পুষ্পিত বাক্য বলেছে ও বিবেকবর্জিত লোকেরাই এর দ্বারা আসক্ত হয় বলেছে।

উত্তর-বেদ, বেদান্ত ও উপনিষদ আপনি বা আপনারা মনে হয় চোখেও দেখেন নাই অধ্যায়ন তো দূরের কথা।
আর গীতা থাকলেও পুরোটা অধ্যায়ন করেছেন বলে মনে হয় না অথবা পড়লেও বুঝেছেন বলে মনে হয় না। বেদ বেদান্ত উপনিষদে নাই গেলাম, ইসকনের গীতা ও তাদেরই করা তাৎপর্য থেকেই আপনার কথাটা মিথ্যা প্রমাণ করে দিচ্ছি। দেখুন- . গীতার ২।৪২ও৪৩নং শ্লোকে আপনার কথাটাই বলা আছে, তবে বেদের চরম উদ্দেশ্য যে এটা নয় তা গীতার ১৫।১৫ স্পষ্ট বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে “আমিই (ঈশ্বরই) সমস্ত বেদের জ্ঞাতব্য এবং আমিই বেদান্তকর্তা ও বেদবিৎ” অর্থাৎ বেদের একমাত্র জানার বিষয় ঈশ্বর। . গীতা২।৪৬নং শ্লোকের তাৎপর্যে ইসকনের গীতায় বলা হয়েছে “বেদে যে কর্মকান্ড ও আচার অনুষ্ঠান ও যাগ যজ্ঞের বিধান দেওয়া আছে তার উদ্দেশ্য জীবকে ক্রমশ আত্ম তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে উৎসাহিত করা।” . এখন প্রশ্ন হল যারা আত্ম তত্ত্বজ্ঞানী তারা কি ঐ সব নিত্যকর্ম যথা যজ্ঞ আচার অনুষ্ঠান করবে না? এর উত্তর গীতাতেই বলা আছে দেখুন- . “তুমি শাস্ত্রোক্ত কর্মের অনুষ্ঠান কর .. কর্ম না করে কেউ দেহযাত্রাও নির্বাহ করতে পারেনা। ভক্তরা সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হন, কারণ তারা যজ্ঞাবশিষ্ট অন্নাদি গ্রহণ করেন। আর যারা নিজের জন্যই কেবল অন্ন পাক করে তারা কেবল পাপই ভোজন করে। আর প্রাণীর জীবন ধারণ থেকে শুরু করে বৃষ্টি ও অন্ন উৎপাদন তা সব শাস্ত্রোক্ত (বেদ) কর্ম থেকে যজ্ঞ উৎপন্ন হয়। বেদ থেকেই যজ্ঞাদি কর্ম উৎপন্ন হয়েছে। বেদ অক্ষর বা পরমেশ্বর থেকে প্রকাশিত। যে ব্যক্তি এই জীবনে বেদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত যজ্ঞ অনুষ্ঠান না করে, সে পাপী ব্যক্তির জীবন ধারণ করা বৃথা।” # গীতা ৩।৮-১৬. সংক্ষেপে. . তাহলে কেন গীতায় পূর্বে বেদকে বিবেক বিবেকবর্জিত পুষ্পিত বাক্য বলেছে? বেদকে বিবেক বর্জিত বাক্য বলেনি, বলেছে বিবেকবর্জিত লোকেরা বেদের পুষ্পিত বাক্যগুলোকে না বুঝে সকাম কর্ম করে। প্রকৃত পক্ষে বেদের মোক্ষ উদ্দেশ্য যারা ধর্মের কিছুই করে না ও বুঝে না তাদেরকে সকাম কর্মের মাধ্যমে ধর্মের পথে নিয়ে এসে নিষ্কাম কর্মে নিয়োজিত করার মাধ্যমে মুক্তি সুখ দেওয়া। গীতাতেই তাই বলা আছে- “ফলভোগের কামনা পরিত্যাগ করে যোগস্থ হয়ে স্বধর্ম বিহিত কর্ম আচরণ কর।” গীতা২।৪৮. . বেদ যদি শুধুমাত্র বিবেক বর্জিত বাক্যই হতো তাহলে কেন গীতায় যজ্ঞ নিয়ে নিম্নোক্ত কথাগুলো বলা হল? দেখুন- . “কেউ দ্রব্য দান রূপ যজ্ঞ করেন, কেউ তপস্যারূপ যজ্ঞ, কেউ অষ্টাঙ্গ ও কেউ পরমার্থিক জ্ঞান লাভের জন্য বেদ অধ্যায়নরূপ যজ্ঞ করেন। যজ্ঞের প্রভাবে পাপ থেকে মক্ত হয়ে তারা যজ্ঞাবশিষ্ট অমৃত আস্বাদন করেন এবং সনাতন ব্রহ্মকে লাভ করেন। হে কুরুশ্রেষ্ঠ! যজ্ঞ অনুষ্ঠান না করে কেউই এই জগতে সুখে থাকতে পারে না, তা হলে পরলোকে সুখপ্রাপ্তি কি করে সম্ভব? এই সমস্ত যজ্ঞই বৈদিক শাস্ত্রে অনুমোদিত হয়েছে…সেগুলোকে যথাযথ ভাবে জানার মাধ্যমে তুমি মুক্তি বা মোক্ষ লাভ করতে পারবে। দ্রব্যময় যজ্ঞ থেকে জ্ঞানময় যজ্ঞ শ্রেয়। সমস্ত কর্মই পূর্ণরূপে জ্ঞানরূপ যজ্ঞে গিয়ে শেষ হয়।” #গীতা ৪।২৮-৩৩. . এখন প্রশ্ন হল অগ্নিহোত্রাদি কর্ম কি করা উচিত না অনুচিত? এই ব্যাপারে গীতাতেই বলা আছে যে- “যিনি অগ্নিহোত্রাদি কর্ম ত্যাগ করেছেন এবং দৈহিক চেষ্টাশুন্য তিনি সন্ন্যাসী বা যোগী নয়। যিনি কর্মফলের আসক্তি ত্যাগ করে কর্তব্য কর্ম করেন তিনিই যথার্থ সন্যাসী বা যোগী।” গীতা ৬।১. এখন আমার প্রশ্ন ইসকনের প্রভুরা প্রতিদিন দ্রব্য যজ্ঞ করেন কিনা? . গীতার ১৩।১নং শ্লোকে অর্জুন যখন কৃষ্ণের কাছে ক্ষেত্র ও ক্ষত্রজ্ঞ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন, তখন কৃষ্ণ একটু বলার পরেই বলেছেন- . “ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের জ্ঞান ঋষিগণ কর্তৃক বিবিধ বেদবাক্যের দ্বারা পৃথক পৃথক ভাবে বর্ণিত হয়েছে। বেদান্তসূত্রে তা বিশেষ ভাবে যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত সহকারে বর্ণিত হয়েছে।”গীতা ১৩।৫. বেদ বেদান্ত যদি তথাকথিত বিবেক বর্জিত বাক্যই হত তাহলে কেন কৃষ্ণ বেদ বেদান্ত ও বৈদিক শাস্ত্রের কথা বার বার বলছেন? প্রকৃত পক্ষে কৃষ্ণ এটাই বলেছেন যে যারা বেদের মূল ভাব বুঝেনা তারা বিবেক বর্জিত। . বেদ যে প্রকৃত পক্ষে কি তা বুঝার জন্য গীতার ১৫।১-৬নং শ্লোকই যথেষ্ট, দেখুন- . “উর্ধ্বমূল ও অধঃশাখা যুক্ত একটি নিত্য অশ্বথু বৃক্ষের কথা বলা হয়েছে। বৈদিক মন্ত্রগুলো সেই বৃক্ষের পত্রস্বরূপ। যিনি বৃক্ষটিকে যানেন তিনিই বেদজ্ঞ। বৃক্ষের শাখাগুলো অধোভাগ ও উর্ধ্বভাগে বিস্তৃত, উহার বাসনারূপ মূলগুলো মানুষ্যলোকে অধোভাগে বিস্তৃত রয়েছে। সেগুলো মনুষ্যলোকে সকাম কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ করে। এই সংসারে স্থিত জীবেরা উর্ধ্ব মূলের স্বরূপ উপলব্দি করতে পারে না। আদি,অন্ত ও স্থিতি যে কোথায় তা কেউ বুঝতে পারে না। তীব্র বৈরাগ্যরূপ শস্ত্রদ্বারা ছেদন করে সত্য বস্তুর অন্বেষণ করা কর্তব্য, যেখানে গমন করলে পুনরায় ফিরে আসতে হয় না। ‘আমি সেই আদি পুরুষের শরণ লইতেছি’ এই বলিয়া তার অন্বেষণ করতে হবে। যারা অভিমান ও মোহশুন্য, সঙ্গদোষ রহিত, নিত্য অনিত্য বিচার পরায়ন,কামনা বাসনা বর্জিত… তারা সেই পরম অব্যয় পদ লাভ করেন।..সেখানে গেলে আর এই জড় জগতে ফিরে আসতে হয় না।” # গীতা১৫ ।১থেকে৬নং সংক্ষেপ। . শাস্ত্র তথা বেদ বিধি যারা পরিত্যাগ করে তাদের কি গতি হবে ও বেদই যে একমাত্র প্রমাণ তা গীতা থেকেই দেখুন- . “যে শাস্ত্র বিধি পরিত্যাগ করে কামাচারে বর্তমান থাকে সে পরম গতি লাভ করতে পারে না। অতএব, কর্তব্য ও অকর্তব্য নির্ধারণে শাস্ত্রই তোমার প্রমাণ। শাস্ত্রে যে কর্ম বিধান বলা হয়েছে, তা জেনে তুমি সেই কর্ম করতে যোগ্য হও।”গীতা ১৬।২৩ও২৪. . “ফলের আশা রহিত ব্যক্তিগণ শাস্ত্রের বিধি অনুসারে অনুষ্ঠান করা কর্তব্য এভাবেই মনকে একাগ্র করে যে যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয় তা সাত্বিক যজ্ঞ। শাস্ত্র বর্জিত যজ্ঞকে তামসিক যজ্ঞ বলে। গীতা ১৭।১১,১৩। . বেদ উক্ত কর্ম কি ত্যাগ করা উচিত?গীতা বলিতেছে- . যজ্ঞ, দান ও তপস্যা ত্যাজ্য নয়,তা অবশ্যই করা কর্তব্য।গীতা ১৮।৫

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *